শিশু সুরক্ষায় হেল্পলাইন বিষয়ক সচেতনাতা জরুরি

ঢাকা: আমাদের দেশের শিশুরা নিজ ঘরে ও বাইরে বিভিন্ন ধরণের সহিংসতার শিকার হয় বিধায় এই ক্ষেত্রে তাদের সহায়তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মহিলা অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে জাতীয় হেল্পলাইন সেন্টার (১০৯) তাদের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে, কিন্ত বেশীরভাগ শিশুদের মাঝে এই হেল্পলাইন বিষয়ে সচেতনাতা সন্তোষজনক নয়।
সম্প্রতি রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে শিশু পাচার প্রতিরোধে পিসিটিএসসিএন কন্সোর্টিয়াম কর্তৃক আয়োজিত এক অর্ধ-বার্ষিকী সভায় আলোচনাকালে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ বলেন যে, নির্যাতনের শিকার শিশুর সহায়তার জন্য যে কোনো টেলিফোন বা মোবাইল থেকে উক্ত নম্বরে টোল ফ্রি ফোন করা যায়।
নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের তাৎক্ষণিক সেবা ও বিদ্যমান অন্যান্য সেবাদানে ২০১২ সালের ১৯ শে জুন উক্ত হেল্পলাইন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই হেল্পলাইন নস্বরটি টোল ফ্রি এবং সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘন্টাই ফোন করা যাবে বলে তারা জানান।
বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে সকল মোবাইল ও অন্যান্য টেলিফোন থেকে এই নম্বরে ফোন কারা যায়। হেল্পলাইন সেন্টার আইনী পরামর্শ, পুলিশী সহায়তা, টেলিফোন কাউন্সেলিং, অন্যান্য সংগঠনের সেবার সাথে সংযুক্ত করা, সহিংসতা প্রতিরোধ সংক্রান্ত তথ্য প্রদান ইত্যাদি সেবা দিয়ে থাকে বলে উক্ত সভায় জানানো হয়।
দেশের শিশুদের ঝুঁকির বিষয়ে আলাকপাত করেতে তারা বলেন, ১৮ বছর বয়সের পূর্বেই শিশুদের একটি বড় অংশের বিবাহ হয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়, শিশুশ্রমের সাথে জড়িত ১৩ শতাংশ শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এবং বিভিন্ন ধরণের নির্যাতনের শিকার। ছেলে শিশুরাও নির্যাতনের শিকার বলে তারা উল্লেখ করেন।
জন্ম নিবন্ধন না থাকার কারণে শিশুদের পাচার, শিশুশ্রম ও বাল্য বিবাহ থেকে রক্ষা করা চ্যালেঞ্জ সাপেক্ষ বলে তারা মনে করেন।
বাংলাদেশের সংবিধান আইনের শাসন, সুবিচার, মানবিক মর্যাদার প্রতি সম্মান ও মূল্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জাত, ধর্ম, বর্ণ ও লিংগ ভিত্তিক কোনো বৈষম্যকে প্রশ্রয় দেয়না। সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্র সকল প্রকার জবরদস্তি ও দাসোচিত শ্রম/ঋণ দাসত্ব রহিত করার পাশাপাশি সকল নাগরিকের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সংবিধান অনুযায়ী সেকারণে বাংলাদেশ রাষ্ট্র মানব পাচার প্রতিরোধ ও প্রতিকারে দায়বদ্ধ।
বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক পরিসরে সমীহ কারার মতো অগ্রগতি অর্জন করলেও দেশটিকে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা মেকাবেলা করতে হচ্ছে বলে তারা জানান। তার মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে মানব পাচার বিশেষ করে শিশু পাচারের বিস্তৃতি। বর্তমানে বাংলাদেশে আভ্যন্তরীন ও আন্ত:সীমান্ত মানব পচার আশংকাজনকভাকে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে উক্ত সভায় উল্লেখ করা হয়।
”বাংলাদেশ সরকার মানবতা বিরোধী এই অপরাধের প্রতিরোধ ও প্রতিকারে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সহযোগিতায় বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের এসব উদ্যোগ ও কর্মপ্রয়াসের মধ্যেও মানব পচার বিষয়ে আমাদের সামগ্রিক অগ্রগতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানদন্ডে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে”।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের মানব পাচার বিষয়ক প্রতিবেদন ২০১৭ সালের ২য় স্তরের নজরদারীতে থাকা অবস্থান ২০১৮ সালেও অপরিবর্তিত রয়েছে। মূলত পাচারের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্তকরন কমে যাওয়া, পাচার বিষয়ক অপরাধের তদন্ত, মামলা পরিচালনা ও অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি না হওয়া এবং পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা না নেওয়া ইত্যাদি কারণ এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অধিকার কর্মীদের মতে, যারা পাচারের শিকার হচ্ছে তাদের ৬০ ভাগেরও বেশী কিশোরী যাদের বয়স ১২ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। এই জাতীয় অপরাধের উদ্দেশ্য হলো যেীন দাসত্ব, জোরপূর্বক শ্রম, বাধ্যতামূলক শোষণমূলক শ্রম ও অংগ পাচারের মতো কার্যকলাপের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন।
পাচারের পরিস্থিতি উন্নয়ন করতে হলে প্রতিরোধ যেমন প্রয়োজন তেমনি পাচারের শিকার ব্যক্তি ও তার পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করাটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তারা মনে করেন।
পিসিটিএসসিএন কন্সোর্টিয়াম কমিউিনিটি ও নেটওয়ার্কিং কার্যক্রম শক্তিশালী করার মাধ্যমে শিশু পাচার প্রতিরোধে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
অধিকার কর্মীরা মনে করেন, হেল্পলাইনের সেবা বিষয়ে সারা দেশে সচেতনাতা সৃষ্টি করা দরকার যাতে শিশু ও অন্যান্যরা এই বিষয়ে অবহিত হয়। এই সেবা ও বেসরকারী সেবার সমন্বয় হলে শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হবে বলে তারা মনে করেন।
সমাপ্ত/