১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ ব্রিটিশ নীতির কারণে

বাংলায় ১৯৪৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের জন্য শুধু খরা দায়ী ছিল না। ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত এই দুর্ভিক্ষের জন্য ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের নীতি বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। ভারতের ইতিহাসে ভয়াবহ এই দুর্ভিক্ষ নিয়ে এক গবেষণায় এ তথ্য মিলেছে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ওই গবেষণায় এ-সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হাজির করা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের অযৌক্তিক নীতির কারণেই হয়েছে সেই দুর্ভিক্ষ। ওই দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারায় ৫০ লাখ মানুষ। খবর দ্য গার্ডিয়ান ও সিএনএনের।

১৮৭৩ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত হওয়া ছয়টি দুর্ভিক্ষকালীন আবহাওয়া ও জলবায়ু সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে ওই গবেষণা চালানো হয়। কোন দুর্ভিক্ষের সময় মাটির আর্দ্রতা কেমন ছিল, গবেষকরা তার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত টেনেছেন। দেখা গেছে, ওই ছয় দুর্ভিক্ষের পাঁচটির প্রধান কারণ মাটির আর্দ্রতার পরিমাণ ভয়াবহভাবে কমে যাওয়া। ১৮৯৬-৯৭ সালে উত্তর ভারতে আর্দ্রতার পরিমাণ ১১ শতাংশ কমে খাদ্য সংকট হয়েছিল।

গবেষণায় বলা হয়, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের প্রধান কারণ খরা নয়। দুর্ভিক্ষের তিন বছর আগেই ভারতের পূর্বাঞ্চল ১৯৪০ সালের বেশিরভাগ সময় ছিল খরার কবলে। ১৯৪১ সালে এসে অবস্থা ভয়াবহ রূপ নেয়। যে বছর ওই দুর্ভিক্ষ প্রবল আকার নেয়, সেই ১৯৪৩ সালে গড়পড়তা বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকই ছিল। বাংলা ১৩৫০ সনে ভয়াবহ ওই দুর্ভিক্ষ হয় বলে একে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ বলা হয়। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক ও এই গবেষণার প্রধান বিমল মিশ্র গার্ডিয়ানকে বলেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলে পোকার আক্রমণের বিস্তৃতির পাশাপাশি দুর্ভিক্ষের বড় কারণ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিয়ানমার ব্রিটিশদের হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় তীব্র ধস।

অবশ্য ভারতের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতামত ভিন্ন। তিনি ১৯৮১ সালে বলেছিলেন, দুর্ভিক্ষের সময়ও বাংলা অঞ্চলে পর্যাপ্ত খাদ্যের জোগান ছিল। যুদ্ধকালীন মুদ্রাস্ম্ফীতি আর ফটকা ক্রেতা ও মজুদদারদের দৌরাত্ম্যের কারণে খাদ্যের দাম গরিব মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে চলে গিয়েছিল।

‘চার্চিলস এম্পায়ার’ গ্রন্থের লেখক রিচার্ড টয়ি মনে করেন, বাংলার এই দুর্ভিক্ষ ওই ব্রিটিশ নেতার জীবনের সবচেয়ে খারাপ রেকর্ডগুলোর একটি। তার মতে, ইউরোপে জার্মানির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তখন তিনি এতই ব্যস্ত যে, বাংলার এই দুর্ভিক্ষ নিয়ে লোকজন তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলেও তিনি এটাকে পাত্তা দেননি।

জার্মানিবাসী বাঙালি মধুশ্রী মুখার্জি ও তার সহযোগীদের লেখা ‘চার্চিলস সিক্রেট ওয়ার’ বা ‘চার্চিলের গোপন যুদ্ধ’। তাদের দাবি, চার্চিল নিজে সরাসরি বাংলার মন্বন্তরের জন্য দায়ী ছিলেন। চার্চিল বিদ্রূপ করে বলেছিলেন, দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী ভারতীয় ‘খরগোশের মতো (বেশি বেশি) সন্তান প্রসব। তা ছাড়া খাদ্য সংকট এত তীব্র হলে মহাত্মা গান্ধী বেঁচে আছেন কীভাবে?