আয়ের পথ দেখাচ্ছে ‘পাঠাও’

স্টার্টআপ থেকে এশিয়ার সেরা তরুণ উদ্যোক্তা

রাজধানী ঢাকার বিরক্তিকর জ্যাম পেরিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে পৌঁছা কিংবা জরুরি কাজটি করা প্রতিদিনের জন্যই একটি চ্যালেঞ্জ। জ্যামের যন্ত্রণা কিছুটা লাঘব করে দেওয়ার জন্যই যাত্রা শুরু করে রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘পাঠাও’, যার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হুসাইন এম ইলিয়াস।

সম্প্রতি ফোর্বস ম্যাগাজিনের এশিয়ার সেরা ৩০ তরুণ উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকের তালিকায় স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশের দুই তরুণ। তাঁদের একজন হুসাইন ইলিয়াস।

ইলিয়াসের শুরু হয়েছিল ছোট্ট ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে। শুধু পরিচিতজনের প্রয়োজনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ পণ্যসামগ্রী বা পার্সেল ঠিক সময়ে যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়া হতো মোটরবাইকের মাধ্যমে। হুসাইন এম ইলিয়াস বলেন, ‘সে সময়ে একদিন আমি বাসে ট্রাফিক জ্যামে তিন ঘণ্টা আটকে ছিলাম। দেখতে পেলাম, গাড়িগুলোর ফাঁকে ফাঁকেই পথ করে চলে যাচ্ছে মোটরবাইকগুলো। সেই মুহূর্তেই আমার ভাবনায় এলো আমরা পার্সেল সরবরাহ করি, তাহলে মানুষ নয় কেন? আমি ফেসবুকে আমার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে পরিচিতজনদের রাইড শেয়ারের অফার দিতে লাগলাম। এভাবেই শুরুটা। অবশেষে চূড়ান্তভাবে আমাদের অ্যাপ চালু করলাম ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে।’ বাংলাদেশে প্রথাগত যেকোনো ব্যবসা শুরু করা সহজ। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ বা স্টার্টআপ সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিনই বলা যায়, আবার তা যদি হয় মোটরবাইকের মতো যানকে পরিবহনসেবা কিংবা রাইড শেয়ারিং অপশন হিসেবে চালু করা। পরিকল্পনাটা বাস্তবায়ন করতে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি।

হুসাইন এম ইলিয়াস বলেন, ‘শুরুর দিকটা খুব ভালো ছিল বলা যাবে না। অনেক সমস্যা নিয়েই আমরা শুরু করেছি। কিন্তু এখন সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে পাঠাওকে জনপ্রিয় করতে পেরেছি। এগিয়ে যাচ্ছি আমরা, সেই সঙ্গে বাংলাদেশও।’

ইলিয়াস বলেন, ‘এক বছরের মাথায় পাঠাওয়ের আরেকটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করে, যেটি আপনারা জানেন পাঠাও ফুড নামে। এটিও আমার আরেকটি স্বপ্নের বাস্তবায়ন। আমাদের পাঠাও অ্যাপ ব্যবহারকারীরা বাসায় বসে বিখ্যাত সব রেস্তোরাঁর খাবার উপভোগ করতে পারবে। পাঠাও ইউজার অ্যাপে প্রবেশ করেই পাঠাও রাইডার, পাঠাও পার্সেল ও পাঠাও ফুড সার্ভিস পাবে। এ জন্য আলাদা অ্যাপ ব্যবহার করতে হবে না।’

তিনি জানান, পাঠাওয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল মাত্র পাঁচটি মোটরবাইক আর ৩০ জন স্বপ্নবান মানুষকে নিয়ে। সেখানে এখন কাজ করছে ৫০০ নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। ঢাকায় চারটি বিশাল অফিস ছাড়াও এরই মধ্যে চট্টগ্রাম ও সিলেটে দুটি পৃথক অফিস স্থাপন করা হয়েছে। আর ঢাকায় চালু করা হলো পাঠাওয়ের কার সার্ভিস।

ইলিয়াস স্বপ্ন দেখেছিলেন, পাঠাও হবে বাংলাদেশের সুপারঅ্যাপ। এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা ছিল ইন্দোনেশিয়ার ‘গো-জেক’। চার দফায় পাঠাও এক কোটি ২৮ লাখ ডলার তহবিল তুলেছে। বর্তমানে এ কম্পানির বাজারমূল্য ১০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। তিনি বলেন, ‘যারা বেকার বা কর্মরত আছে তারা আমাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। আমরা তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবেই দেশের অন্যতম বৃহৎ চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছি।’

হুসাইন ইলিয়াস বলেন, ‘আমাদের এ যাত্রায় সবচেয়ে শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে, আমরা নিজেদের একই সঙ্গে গড়ে তুলছি আবার এগিয়েও যাচ্ছি। এমনকি যদি একটি ভুল হয়ে যায়, আমরা তা থেকে শিখে সঠিকটি করছি। তবে কোনোভাবেই থেমে যাওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে জড়তা অত্যন্ত বিপজ্জনক, এটি আপনাকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলবে।’

তিনি বলেন, “পাঠাওয়ের আগে বাংলাদেশে মোটরসাইকেলে রাইড সেবা ছিল না। আমরা পরিবহনে নতুন মাত্রা যোগ করি। পাঠাও শুধু একটি কম্পানি নয়, এটি একটি সংস্কৃতি। রাজধানী ঢাকায় মানুষের যাতায়াতে আমরা বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছি। তারপর তা অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে দিয়েছি। এখন পাঠাওয়ের কারণে বাংলাদেশে মোটরসাইকেলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত একটি স্বাভাবিক দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। একসময় মোটরসাইকেল ব্যবহারকে ‘ব্যাডবয়’ ইমেজ হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু আমরা এখন আয়ের পথ খুলে দিয়ে এটিকে পণ্যে পরিণত করেছি। বর্তমানে আমাদের এক লাখেরও বেশি চালক শুধু পরিবহন সেবা দিচ্ছে না, তারা খাদ্য সরবরাহ করছে, প্রয়োজনীয় জিনিসসহ আরো অনেক কিছু পৌঁছে দিচ্ছে। আমাদের সব চালকই নিজেদের বস। সব ক্ষেত্রেই তারা নিজেদের মতো করে কাজ করতে পারছে।”

তিনি বলেন, ‘বর্তমান এ সাফল্যের কৃতিত্ব শুধু পাঠাও কিংবা আমার নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের। আমি মনে করি, আমি যা করেছি, তা একা করতে পারিনি, বরং আমার টিম ও অংশীদারদের সহায়তায় এ সাফল্য এসেছে। সুতরাং টিমের সদস্যরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন উদ্যোক্তাদের আমার পরামর্শ হচ্ছে, সময় বেশি লাগলেও সঠিক লোককে নিজের সঙ্গে নিন।’

এদিকে রাইডারদের আর্থিক নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা ভেবে সম্প্রতি ডটলাইন বাংলাদেশ ও পাঠাও যৌথভাবে পাঠাওয়ের রাইডার ও ড্রাইভারের জন্য একটি বিশেষায়িত বীমা সেবা চালু করেছে। এর আওতায় রাইড চলাকালীন পাঠাওয়ের কোনো যাত্রী বা চালকের দুর্ঘটনাজনিত গুরুতর আঘাত হলে এবং চলাচলে অপারগ হলে অথবা দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে অথবা মৃত্যুবরণ করলে ওই ব্যক্তি বীমা সুবিধা পাবে।

হুসাইন এম ইলিয়াস বললেন, “পাঠাওয়ের ‘মুভিং সেফলি’ স্লোগানের মূল ভাবনার সঙ্গে রাইডার ও ড্রাইভারের বীমাব্যবস্থার কথাও মাথায় আসে। আমরা আমাদের রাইডারদের নিরাপত্তাকে সব সময় অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি। দিন শেষে রাইডারদের নিরাপদে ঘরে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।”
সূত্র : কালের কণ্ঠ