বাঙালি জীবনে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ও রবীন্দ্র-নজরুল

তীন সরকার
বাঙালির জীবনে বৈশাখ আর রবীন্দ্রনাথ অনপনেয় সূত্রে গ্রথিত। ‘এসো হে বৈশাখ’ বলে যেদিন আমরা নববর্ষকে আহ্বান করি, সেই পহেলা বৈশাখেই আমাদের চিত্তের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে যায় পঁচিশে বৈশাখ। সেদিন থেকেই আমরা পঁচিশে বৈশাখ পালনের প্রস্তুতিতে লেগে যাই। শুধু পঁচিশে বৈশাখেই নয়, বৈশাখজুড়েÑ এমনকি জ্যৈষ্ঠেও চলে আমাদের রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান। আবার এই জ্যৈষ্ঠেই জন্ম নিয়েছিলেন নজরুল, এগারোই জ্যৈষ্ঠে আমরা ঘটা করে পালন করি নজরুলজয়ন্তী। কখনো কখনো এই দুই অনুষ্ঠান একীভূত হয়ে যায় রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তীতেÑ একই সঙ্গে আমরা প্রাণের অর্ঘ্য নিবেদন করি রবীন্দ্রনাথকেও, নজরুলকেও। এমনটিই হয়ে এসেছে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগ থেকেই। তবে পাকিস্তান জমানায় বিষয়টি এত সহজে সম্পন্ন হতে পারত না। নানাদিক থেকে নানা ধরনের বিপত্তি এসে ভর করত। মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানে যারা রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান করে তারা আসলে হিন্দুস্থানের দালালÑ এমন অভিযোগেও আমাদের বিদ্ধ হতে হতো। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালন করতে গিয়ে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হয় আমাদের। তখন থেকেই পাকিস্তানে রবীন্দ্রবিরোধিতা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেওয়া হয় নজরুলকে; ‘মুসলমান’ নজরুল যে ‘হিন্দু’ রবীন্দ্রনাথের চেয়ে অনেক বড় এ কথা যারা বিশ্বাস করে না তারা যে পাকিস্তানের শত্রু, পাকিস্তানে বাস করার কোনোই অধিকার যে তাদের নেইÑ এমন ঘোষণাও সেদিন আমাদের শুনতে হয়েছে। শুধু কানে শোনা নয়, দৈহিক আক্রমণের সামনেও পড়ে যেতে হয়েছে। আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথাই বলি। তখন আমি ময়মনসিংহ শহরের নাসিরাবাদ কলেজে অধ্যাপনা করি। ১৯৬৭ সালের জুনে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের বাজেট অধিবেশনে, একান্ত অপ্রাসঙ্গিকভাবেই রবীন্দ্রবিরোধী বক্তব্য দিয়ে বসলেন খান আবদুস সবুর ও খাজা শাহাবুদ্দিন। তাদের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বাঙালিদের স্বাধিকার চেতনা নতুন গতিবেগ পেয়ে গেল। একষট্টি সালের পর সাতষট্টিতেই এখানে রবীন্দ্রচর্চার জোয়ার এসে যায়। আগে এখানে পঁচিশে বৈশাখে রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হতো, বাইশে শ্রাবণে রবীন্দ্র মৃত্যু দিবসে তেমন কোনো অনুষ্ঠান হতো না। কিন্তু সাতষট্টি সাল থেকেই পাকিস্তানি শাসকদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে ব্যাপকভাবে রবীন্দ্র মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন করা হতে থাকে। আটষট্টি সালে ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবে আমরা এমনই একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম। বক্তৃতা দিচ্ছিলেন সে সময়কার একজন বিশিষ্ট ছোট গল্পকার নীলু দাস। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান কতভাবে যে বাঙালির সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে এবং রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিলে যে আমরা সাংস্কৃতিক দিক থেকে একেবারেই দীন হয়ে যাবÑ এ কথাগুলোই তিনি নানা দৃষ্টান্ত সহযোগে বলে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখা গেল লাঠি হাতে দাঁড়ানো কয়েকটি যুবককে। তারা চিৎকার করে বলতে লাগল ‘চুপ করুন, চুপ করুন। থাকবেন পাকিস্তানে, আর হিন্দুস্থানের কবির গুণগান করবেন সেটি চলবে না। পাকিস্তানে থাকতে হলে ইকবালের কথা বলতে হবে, নজরুলের কথা বলতে হবে।’ পকেট থেকে ছোরা বের করে আস্ফালন করতে করতে অভিনব এক সেøাগান তুললÑ ‘রবীন্দ্রগোষ্ঠী মুর্দাবাদ, নজরুল গোষ্ঠী জিন্দাবাদ।’ এর পরই মঞ্চে উঠে ওরা রবীন্দ্রনাথের ছবিটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল। মঞ্চে রাখা হারমোনিয়াম-তবলায় লাথি মেরে ফেলে দিল। পকেট থেকে ছুরি বের করে নানারকম খিস্তিখেউর করে চলল। আমাদের মনে হলোÑ কতকগুলো শুয়োর যেন ফুলের বাগানে ঢুকে সব তছনছ করে দিল। আমরা কয়েকজন দর্শক নিথর হয়ে মঞ্চের সামনে বসেছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম এই গু-াদের আরও কা-কীর্তি প্রত্যক্ষ করার জন্য। ওদের লাঠি কিংবা ছুরির প্রত্যক্ষ আঘাত শরীরে লাগেনি আমাদেরÑ হয়তো বা করুণাবশতই আমাদের কেবল ভয় দেখিয়েই কক্ষ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আমাদেরই বন্ধু অধ্যাপক আবদুল কাদির খান। খুবই সুরসিক মানুষ ছিলেন তিনি। সব ব্যাপারেই তার রসিকতার পরিচয় পাওয়া যেত। সেদিনের সেই ঘটনাটি নিয়েও পরদিন প্রেসক্লাবে বসে অধ্যাপক খান নানা ধরনের রসসিক্ত কথা বলে যাচ্ছিলেন। তার রসিকতার অন্তরালে যে বেদনার ধারাপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছিল, সেটিও শ্রোতাদের কাছে গোপন থাকেনি। ‘রবীন্দ্রগোষ্ঠী মুর্দাবাদ, নজরুলগোষ্ঠী জিন্দাবাদ’ সেøাগানটির উল্লেখ করে তিনি বলছিলেন, আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় ‘রবীন্দ্রনাথ বড়, না নজরুল বড়’ তা হলে আমি কী বলব জানেন? বলবÑ ‘রবীন্দ্রনাথও বড় না, নজরুলও বড় না। বড় হলো লাঠি। লাঠি যার হাতে আছে, তার চেয়ে বড় কেউ নেই।’ তখনকার দিনে সাধারণত লাঠিবাজি করেই গু-ামি চলত, কখনো গু-াদের হাতে ছোরাও থাকত। বোমাবাজির প্রচলন তখনো ঘটেনি। বিগত শতকের ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানের শাসকরা একদল লাঠিবাজ গু-াকেই ‘এনএসএফ (ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন) নাম দিয়ে সংগঠিত করেছিল এবং এদের দিয়েই নানা অপকর্ম করাত। এরাই সেদিন ‘নজরুলগোষ্ঠী জিন্দাবাদ’ বলে ‘রবীন্দ্রগোষ্ঠীকে’ শায়েস্তা করতে গিয়েছিল। একদল মতলববাজ পাকিস্তানবাদী দীর্ঘকাল ধরেই নজরুলকে বড় করতে গিয়ে নানা ধরনের ধান্ধাবাজি করে আসছিল। ময়মনসিংহ শহরে বিদগ্ধ সাহিত্যরসিক বলে পরিচিত একজন বক্তার বক্তব্য ছিল এ রকম : “রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধুলার তলে।’ আর নজরুল বলেছেন, ‘বল বীর, চির উন্নত মম শির।’ এতেই বোঝা যায় যে, নজরুল হলেন পৌরুষের কবি আর রবীন্দ্রনাথ নিতান্ত দুর্বল আত্মনিবেদনপ্রবণ একজন কবি।… রবীন্দ্রনাথ সাম্প্রদায়িক, কেবল হিন্দুশাস্ত্রের নানা কথা নিয়ে গান-কবিতা লিখেছেন, মুসলমানের কথা কিছুই লেখেননি। নজরুল রবীন্দ্রনাথের মতো সাম্প্রদায়িক ছিলেন না বলেই হিন্দুপুরাণ নিয়েও কত কথা বলেছেন।… রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বকবি বলা তো একান্তই মিথ্যাচার। বিশ্বকবি বলা যায় শেক্সপিয়ারকে। তিনি যে বলেছেন, ‘কাওয়ার্ডস ডাই মেনি টাইমস বিফোর দেয়ার ডেথÑ’ এটি হচ্ছে বিশ্বজনীন বাণী, বিশ্বের সব মানুষের জন্য সত্য, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সর্বজনগ্রাহ্য। অন্যদিকে হিন্দুদের উপনিষদে যেসব কথা আছে সেসবেরই পুনরাবৃত্তি করেছেন রবীন্দ্রনাথ। সেসব হচ্ছে হিন্দুদের বিশ্বাসের কথা, বিশ্বজনীন বাণী নয়। কাজেই রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি হন কী করে?… তা ছাড়া পৃথিবীর সব বড় কবিরই একেকটি মাস্টারপিস থাকে। যেমন ফেরদৌসির শাহনামা, শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট, গ্যেটের ফাউস্ট। রবীন্দ্রনাথের কি এমন কোনো মাস্টারপিস আছে?…” এ রকম বক্তব্যের সমর্থক যেমন ছিল, বিরোধীও ছিল। সেই বিরোধিতা থেকেই বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের অবদানের স্বরূপ-সন্ধান চলছিল, যথাযথ পদ্ধতিতে রবীন্দ্র-নজরুলচর্চার সূত্রপাত ঘটেছিল। এরই ফলে দেশজুড়েই প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠেছিল, শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল বাঙালির অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিক চেতনার ধারাটি। পাকিস্তানবাদী তথা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষান্ধরা এই সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চেতনাকে প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। এ সময়ই কর্তৃপক্ষীয় উদ্যোগে ময়মনসিংহে নজরুলের বাল্যস্মৃতির ধারক ত্রিশাল ও কাজীর সিমলায় নজরুলজয়ন্তীর আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনের উদ্দেশ্যটি মোটেই সাধু ছিল না। প্রকৃত নজরুলের খ-ায়ন ঘটানোর অপপ্রয়াসই আয়োজকদের চেতনায় ক্রিয়াশীল ছিল। যে নজরুল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মানবতার কবি, তাকেই পরিণত করতে চেয়েছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদের কবিরূপে। এ প্রসঙ্গে বদরুদ্দীন উমর তার ‘নজরুল ইসলাম অহিফেন’ প্রবন্ধে যা লিখেছিলেন তা বিশেষভাবে স্মর্তব্য : ‘পূর্ব পাকিস্তানে আজ নজরুল-সাহিত্যচর্চার হিড়িক পড়েছে। এতে সবারই উৎসাহবোধ করার কথা। কিন্তু নজরুল-সাহিত্যচর্চার নামে যে কীর্তিকলাপ এখন শুরু হয়েছে তাতে উৎসাহের চেয়ে আশঙ্কাই বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ এই সাহিত্যচর্চার নামে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী গণসাহিত্যের প্রতিনিধি নজরুল ইসলাম আজ পরিণত হতে চলেছেন সাম্প্রদায়িক সাহিত্য ও রাজনীতির হাতিয়ারে। সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের হাতে পড়ে নজরুল আজ ইসলাম ধর্মের সাধক, মুসলিম সংস্কৃতির বাহক এবং সাম্প্রদায়িক সাহিত্যের অন্যতম প্রতিনিধি।’ যাহোক বলছিলাম : ষাটের দশকের গোড়ায় নজরুলের বাল্য স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালে নজরুলজয়ন্তী উদযাপনের কথা। শুনেছি, প্রথমবারেই সেখানে নজরুলজয়ন্তী অনুষ্ঠানে একজন ‘সরকারি বক্তা’ যা বলেছিলেন, তা ছিল এ রকমÑ “নজরুল অনেক হাম্ত-নাত রচনা করেছেন, অনেক ইসলামি গান ও কবিতা লিখেছেন। এসবই আমাদের পাকিস্তানের আদর্শকে মজবুত করে তুলেছে। কিন্তু নজরুল কিছু কিছু খোদাদ্রোহী কথাও বলেছেন। তিনি ‘খোদার আসন আরশ’ ছেদন করতে চেয়েছেন, ‘ভগবান-বুকে পদচিহ্ন এঁকে’ দিতে চেয়েছেন। এসবই হচ্ছে বড় ধরনের গুনাহ। এই গুনাহর জন্যই আল্লাহ তাকে শাস্তি দিয়েছেন। তিনি আর এখন কথাই বলতে পারেন না, তার মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে গেছে।… আসুন, আমরা সবাই তার জন্য দোয়া করি, আল্লাহ যেন তার গুনাহ মাফ করে দেন।” নানাভাবে নানা সময়ে নানা মহল থেকেই নজরুলকে খ-ায়নের অপপ্রয়াস দেখা গেছে। সে রকম অপপ্রয়াসের যে অবসান ঘটে গেছেÑ তেমন কথা এখনো বলা চলে না। তবে এ প্রসঙ্গে নজরুল জীবনীকার গোলাম মুরশিদের একটি বক্তব্য বিশেষভাবে অনুধাবনীয় বলেই আমি মনে করি। মুরশিদ লিখেছেনÑ ‘নজরুল কোনো অখ-, অপরিবর্তনশীল এবং অভিন্ন উপকরণে নির্মিত মনোলিথ নন। তার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়Ñ তিনি আসলে নানা নজরুলের একখানি মালা। তিনি যেমন বিদ্রোহী, তেমনি তিনি প্রেমিক। তিনি যেমন রেলের ভাড়া জোটাতে অপারগ, তেমনি তিনি শকটবিলাসী। তিনি রাজনীতিমত্ত, আবার রাজনীতিবিরাগী। তিনি কখনো ধর্মহীন, কখনো ভক্তিরসে সিক্ত পরম ধার্মিক।’ য় যতীন সরকার : শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক