জোরদার হচ্ছে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান

দেশে গ্যাসের ঘাটতি চলছে দীর্ঘকাল ধরে। শিল্প, বাণিজ্য, আবাসিকসহ সব খাতেই জ্বালানির জন্য হাহাকার। এই ঘাটতি মেটাতে চারগুণ বেশি দামে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। কিন্তু বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশিতে তেল-গ্যাসের অনুসন্ধান আজও গতি পায়নি। এখানে তেল-গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। একই সমুদ্রে নিজেদের সীমানায় ভারত ও মিয়ানমার ঠিকই গ্যাসের সন্ধান পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সমুদ্রে বড় ধরনের অনুসন্ধান শুরুই করতে পারেনি। সাগরে তেল-গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা জানতে যে মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভে প্রয়োজন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা চার বছর ধরে আটকে আছে। অবশেষে সেই জট খুলছে। মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভে চালানোর অনুমোদন দিয়েছে সরকার। শিগগির নির্বাচিত কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করবে পেট্রোবাংলা। জোরদার হবে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম।

আন্তর্জাতিক আদালতে ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর সর্বমোট এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চলের মালিক হয় বাংলাদেশ। এরপর কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বিশাল এই সমুদ্র এলাকার সম্পদ আহরণে এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভূতত্ত্ববিদ বদরুল ইমাম বলেছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কারণে বাংলাদেশ সরকার সাগরে এখনও জরিপই শুরু করতে পারেনি। তিনি বলেন, গত ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে একটি কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। এখন সেই সংকটের মাসুল দিতে হচ্ছে পুরো জাতিকে। গত ১৫ বছরে প্রতি বছর গড়ে একটি গ্যাসকূপও খনন করা হয়নি। নতুন গ্যাসের সন্ধান না পাওয়ায় এখন এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে, যা দেশের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার আমদানির পাশাপাশি দেশের ভেতরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর জোর দিয়েছে। এজন্য মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত মাসে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে নরওয়ের টিজিএস এবং ফ্রান্সের স্কামবার্জার কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তির প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন। এখন আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পন্ন করছে পেট্রোবাংলা। তারা টিজিএস ও স্কামবার্জার কনসোর্টিয়ামকে চুক্তির জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আগামী সপ্তাহে তাদের একটি প্রতিনিধি দল এ বিষয়ে আলোচনার জন্য ঢাকায় আসার কথা।

সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও মাল্টিক্লায়েন্ট জটিলতা :খনিজসম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বঙ্গোপসাগরের অগভীর ও গভীর অংশকে মোট ২৬টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে অগভীর অংশে ব্লক ১১টি। আর গভীর সমুদ্রে ব্লক ১৫টি। অগভীর সমুদ্রের ৯ নম্বর ব্লকে ১৯৯৬ সালে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কার করে কেয়ার্নস এনার্জি, যা দেশের একমাত্র সামুদ্রিক গ্যাসক্ষেত্র। ১৯৯৮ সালে সেখান থেকে গ্যাস উৎপাদন শুরু হয়। মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় ২০১৩ সালে গ্যাসক্ষেত্রটি পরিত্যক্ত হয়। এ ছাড়া কুতুবদিয়ার সাগরবক্ষে গ্যাসের সন্ধান মিললেও তা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য বিবেচিত হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র্রভিত্তিক তেল-গ্যাস কোম্পানি কনোকো ফিলিপস ২০০৮ সালের দরপত্র প্রক্রিয়ায় গভীর সমুদ্রের ডিএস-১০ ও ডিএস-১১ নম্বর ব্লক ইজারা নিয়েছিল। দু’বছর অনুসন্ধান কাজ করার পর গ্যাসের দাম বৃদ্ধি নিয়ে মতভেদের কারণে ২০১৪ সালে ব্লক দুটি ছেড়ে দেয় কনোকো। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ডাকা অন্য আরেক আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রের ডিএস-১২, ডিএস-১৬ ও ডিএস-২১ এই তিন ব্লকের জন্য যৌথভাবে দরপ্রস্তাব জমা দিয়েছিল কনোকো ও স্টেট অয়েল। পরবর্তীকালে কনোকো নিজেকে সরিয়ে নেওয়ায় ব্লকগুলো ইজারা দেওয়া সম্ভব হয়নি। একই সময়ে অগভীর সমুদ্র্রের ব্লকগুলোর জন্য ভিন্ন একটি দরপত্র আহ্বান করে পেট্রোবাংলা। এই দরপ্রক্রিয়ায় একমাত্র প্রস্তাবদাতা হিসেবে এসএস ১১ নম্বর ব্লক সান্তোস ও ক্রিস এনার্জি এবং এসএস ৪ ও এসএস ৯ নম্বর ব্লক ভারতীয় দুটি কোম্পানি ওএনজিসি বিদেশ (ওভিএল) ও অয়েল ইন্ডিয়া (ওআইএল) ইজারা নিয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে।

ব্লকগুলোতে দ্বিমাত্রিক জরিপের কাজ শেষ হয়েছে। অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরপর জ্বালানি বিভাগ বিশেষ আইনে দরপত্র প্রক্রিয়া ছাড়াই বাকি ব্লকগুলো ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এজন্য ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে আগ্রহপত্র চায় পেট্রোবাংলা। সিঙ্গাপুরের ক্রিস এনার্জি, দক্ষিণ কোরিয়ার পোসকো দাইয়ু ও নরওয়ের স্টেট অয়েল আগ্রহ প্রকাশ করে। পরবর্তীকালে প্রস্তাব চাওয়া হলে ১২ নম্বর ব্লকের জন্য শুধু দাইয়ু প্রস্তাব দাখিল করে। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ডিএস ১২ নম্বর ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দাইয়ু করপোরেশনের সঙ্গে উৎপাদন-অংশীদারিত্ব চুক্তি (পিএসসি) সই করে পেট্রোবাংলা। তারা এই ব্লকে প্রাথমিক অনুসন্ধান কাজ শুরু করেছে। দাইয়ু এই ব্লকের পাশেই মিয়ানমারের একটি সমুদ্র ব্লকে গ্যাস তুলছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্রে ভালো সাড়া না মেলায় সরকার পুরো সমুদ্রসীমায় একটি পূর্ণাঙ্গ বহুমাত্রিক জরিপ বা মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সার্ভের কাজ করার জন্য ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে পেট্রোবাংলা। দরপত্র জমা পড়ে পাঁচটি। দরপত্র মূল্যায়নে নরওয়ের কোম্পানি টিজিএস এবং ফ্রান্সের স্কামবার্জার কনসোর্টিয়াম যোগ্য বলে নির্বাচিত হয়। এরপর পেট্রোবাংলা প্রস্তাব চূড়ান্ত করে চুক্তিপত্র অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন নিতে জ্বালানি বিভাগে ফাইল পাঠায়। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া হঠাৎ বাতিল করে আবার দরপত্র আহ্বানের জন্য পেট্রোবাংলাকে নির্দেশনা দেওয়া হয় জ্বালানি বিভাগ থেকে। পরে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হলে ফের পাঁচটি প্রস্তাব জমা পড়ে। এবারও দরপ্রক্রিয়ায় টিজিএস-স্কামবার্জার কনসোর্টিয়াম প্রথম হয়। এরপর চুক্তির প্রস্তাবনা জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উত্থাপন করা হয়। সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, সেখানে দরপত্র প্রক্রিয়া সঠিক হয়নি বলে আপত্তি ওঠে। পরে দরপত্র মূল্যায়নের যথার্থতা যাচাইয়ের জন্য আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি তাদের প্রতিবেদন মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠায়। এরপরও দীর্ঘদিন এই প্রস্তাবটি আটকে থাকে। অবশেষে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপে এই জটিলতা দূর হলো। এখন সাগরে জরিপ চালাতে আর কোনো বাধা নেই।

পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, টিজিএস ও স্কামবার্জার কনসোর্টিয়াম দুই বছর জরিপ চালাবে। তারা যে তথ্য-উপাত্ত পাবে তা বিশ্নেষণ করে খনিজসম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যাবে। এতে বিদেশি তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে। তিনি জানান, কনসোর্টিয়ামটি বিনামূল্যে এই অনুসন্ধান কাজ করে দিতে চেয়েছে। তবে তারা জরিপের ফলাফল বিক্রি করতে পারবে।