জ্ঞানতাপস, পরমাণুবিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়া

মো. মশিউর রহমান
ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া (১৯৪২-২০০৯) খ্যাতনামা পরমাণু বিজ্ঞানী। পদার্থবিজ্ঞান ও বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ক বইয়ের লেখক ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি দীর্ঘদিন আণবিক শক্তিবিষয়ক গবেষণায় অবদান রেখেছেন, বাংলাদেশ আণবিক শক্তি গবেষণা কেন্দ্রকে গড়ে তুলেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক স্তরের পদার্থবিজ্ঞান, ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের ছাত্রদের জন্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে Fundamentals of Thermodynamics, Reactor Physics Ges Fundamentals of Electromagnatics উল্লেখযোগ্য। Fundamentals of Electromagnatics বইটি বিখ্যাত আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা Tata McGraw-Hill ১৯৮২ সালে বিশ্বব্যাপী প্রকাশ করে এবং বইটি বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। তাঁর অন্যতম গ্রন্থ ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়। ৪৬৪ পৃষ্ঠার সুপরিসর এই গ্রন্থে বাংলাদেশের বহুল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। তাঁর আরেকটি গ্রন্থের নাম ‘বাংলাদেশের রাজনীতি ও সরকারের চালচিত্র’, যা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড ১৯৯৫ সালে প্রকাশ করে। স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার পর ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া রাজনৈতিক চেতনায় উজ্জীবিত হওয়ার পাশাপাশি আণবিক শক্তি কমিশন গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সাভারে এ কমিশনের জমি গঠন থেকে শুরু করে এটি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পুরো কৃতিত্বই তাকে দেওয়া যায়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ক্ষেত্রে তার অতি গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। মহান জ্ঞানতাপস, নিভৃতচারী পরমাণুবিজ্ঞানীর মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার জীবনকে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমত, স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী তার ছাত্রজীবন ও ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া এবং দ্বিতীয়ত, তার বিজ্ঞান গবেষণায় নিবেদিত জীবন। তাঁর ডাক নাম সুধা মিয়া। তিনি ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪২ সালে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ফতেহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মানসম্মত লেখাপড়ার জন্য তাকে রংপুর জিলা স্কুলে ভর্তি করা হয়। এ স্কুল থেকে ১৯৫৬ সালে প্রথম শ্রেণিতে ম্যাট্রিকুলেশন, রাজশাহী বিজ্ঞান কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে শিক্ষা বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ১৯৬১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৩ সালের ৯ এপ্রিল তৎকালীন পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশনে যোগদান করেন। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজের ডিপ্লোমা অব ইমপেরিয়াল কলেজ কোর্স কৃতিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করেন। ১৯৬৭ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলে তাকে ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকার আণবিক শক্তি গবেষণা কেন্দ্রে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালে ইতালির ট্রিয়েস্টের আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র তাকে অ্যাসোসিয়েটশিপ প্রদান করে। এ সুবাদে তিনি ১৯৬৯, ১৯৭৩ ও ১৯৮৩ সালে ওই গবেষণা কেন্দ্রে প্রতিবার ছয় মাস গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৬৯ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন শহরের ড্যারেসবেরি নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরিতে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত তিনি তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির কার্লসরবয়ে শহরের আণবিক গবেষণা কেন্দ্রে আণবিক রিঅ্যাক্টর বিজ্ঞানে উচ্চতর প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ভারতের আণবিক শক্তির দিল্লির ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন।

ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ছাত্রাবস্থ্থায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানে পড়ার সময় সংশ্নিষ্ট হন ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে। তিনি ফজলুল হক হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন এবং ছাত্রলীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৬১-৬২ শিক্ষাবর্ষের হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালে শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলনে গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন তিনি। কারাগারেই দেখা হয় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। ১৯৬৭ সালে লন্ডনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফেরার পর একই বছর ১৭ নভেম্বর বঙ্গবন্ধুকন্যাকে (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) তিনি বিয়ে করেন। স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের কারণে তিনি কিছুদিন কারাবরণ করেন। ১৯৭১ সালে এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং এর আগে-পরের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে তার উপস্থিতি ছিল। তিনি সর্বদা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী ছিলেন। বঙ্গবন্ধু ড. ওয়াজেদ মিয়াকে বিজ্ঞানী হিসেবেই তাকে দেখতে চেয়েছেন। রাজনীতিতে তাকে কখনোই জড়ানোর চেষ্টা করেননি। ড. ওয়াজেদ মিয়া ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সাত বছর নির্বাসিত জীবন কাটান। ৪০ বছরের বিবাহিত জীবনে ড. এম এ ওয়াজেদের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি তাঁর পরিবারের পাশে থেকে যে ধৈর্য, সাহস ও সেবার পরিচয় দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন, তা অসাধারণ।

জ্ঞানতাপস ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া বঙ্গবন্ধু শিক্ষা গবেষণা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে তিনি পরপর দু’বার বাংলাদেশ আণবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮৩, ৮৪ ও ৮৫ সালে তিনি পরপর তিনবার ওই বিজ্ঞানী সংঘের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চার বছর তিনি বাংলাদেশ পদার্থবিজ্ঞান সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯৭ সালে দু’বছর মেয়াদের জন্য ওই বিজ্ঞান সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৯ সালে দু’বছর মেয়াদের জন্য একই সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত পরপর দুটি মেয়াদকালের জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান উন্নয়ন সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এবং ১৯৯৪ থেকে ‘৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি পরপর দুটি মেয়াদকালের জন্য ওই বিজ্ঞান সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১-৯২ সালে তিনি বাংলাদেশ আণবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘেরও সভাপতি নির্বাচিত হন। এ ছাড়া ১৯৮৯ থেকে ‘৯৩ সাল পর্যন্ত পরপর তিনটি মেয়াদকালের জন্য তিনি ‘বাংলাদেশ বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানজীবী সমিতি’র সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ঢাকার রংপুর জেলা সমিতির ১৯৯৪ থেকে ‘৯৭ সাল পর্যন্ত এ সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা এবং ঢাকার বৃহত্তর রংপুর কল্যাণ সমিতি, উত্তরবঙ্গ জনকল্যাণ সমিতি, রাজশাহী বিভাগীয় উন্নয়ন ফোরাম, বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদ এবং রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার মির্জাপুর বছিরউদ্দিন মহাবিদ্যালয়ের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। ড. ওয়াজেদ মিয়া আণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে ১৯৯৯ সালে অবসর নেন। ২০০৯ সালের ৯ মে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ৬৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

বাংলাদেশের রংপুরে অবস্থিত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রাণপুরুষ এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে ড. ওয়াজেদ রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বাংলাদেশের ঢাকায় অবস্থিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিজ্ঞান গবেষণার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ বিজ্ঞানাগার এম এ ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

বিজ্ঞান নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন ওয়াজেদ। প্রথিতযশা পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার স্বপ্ন ছিল, বাংলাদেশের রূপপুরে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপিত হবে। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, বিশ্বমাঝে বাংলাদেশ বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ একটি দেশ হিসেবে পরিচিতি পাবে। সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে তার নিরলস পরিশ্রম অব্যাহত রেখেছিলেন আমৃত্যু। তার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য সামনে রেখে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০ তারিখে প্রতিষ্ঠিত হয় ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন। এ ফাউন্ডেশন বিভিন্ন স্কুলে ‘বিজ্ঞান চর্চা করি, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ি’- এ স্লোগান নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক সেমিনার, সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা ও বিজ্ঞানবিষয়ক গণসচেতনমূলক অনুষ্ঠান করে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক ডিজিটাল রাষ্ট্রে পরিণত করাই আমাদের উদ্দেশ্য।

কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজ